মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে- কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত। মহাকবি, নাট্যকার, বাংলা ভাষায় সনেট এবং হন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামের এই বাড়িতেই জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল।
বাড়িটি নির্মাণে বৃটিশ আমলে ব্যবহৃত চুন-সুরকি ও ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে রয়েছে মধুসূদন দত্তের পৈত্রিক বাড়ি, তার কাকার বাড়ি, বাড়ি সংলগ্ন পূজা মণ্ডপ, দিঘীসহ উদ্যান। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক । এখানে দুটো ভবন ও পূজা মণ্ডপ সংস্কার সংরক্ষণপূর্বক একটি পাঠাগার ও একটি আদুঘর তৈরি করা হয়েছে। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে স্থাপিত হয়েছে কবির আবক্ষ ভাস্কর্য। রয়েছে মধু উদ্যান। যাকে একসাথে মধুপল্লী নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। পুরনো একটি একতলা ভবনে সংরক্ষণ করা হয়েছে মধুসূদন দত্তের বসতবাড়িতে ব্যবহৃত খাট, টেবিল, আলনা, কাঠের সিন্দুক, লোহার সিন্দুক প্রভৃতি। জাদুঘরের সামনে রয়েছে ১৯৮৪ সালে শিল্পী বিমানেশ চন্দ্রের তৈরি কবির একটি আবক্ষ ভাস্কর্য। এছাড়াও মধুপল্লীর সীমানা প্রাচীরের ভিতরে নির্মাণ করা হয়েছে অপেক্ষাগার, প্রক্ষালনকক্ষ, প্রশাসনিক ভবন প্রভৃতি।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভাবধারা বাংলা.. সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দুক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন। ১৮৬০ সালে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং এই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনী নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি মেঘনাদবধ কাব্য। এটি বাংলা' ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর নব আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দও বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার জেনারেল হাসপাতালে মহাকবি মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে মাইকেল মধুসুদন দত্তের বাড়িটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত একটি পুরাকীর্তি।


0 মন্তব্যসমূহ