আবেগী নিউজ

আবেগী নিউজ

একটা রিকশা ওয়ালা চাচার মনের কথা

একটা রিকশা ওয়ালা চাচার  মনের কথা

দুপুরে বাজার নিয়ে বাসায় ফিরবো, বুড়োমত এক চাচা মিয়া আসলেন। বয়স ৫৫+ হবে, গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে বাজার রিকসায় তুললো। রিকসা চলতে শুরু করলো, কিন্ত একটা ব্যাপার হলো এই শহরের বাকি রিকসাগুলোর মত এই রিকসায় মোটর নেই, এটা প্যাডেল চালিত। শুরুতে আমি খেয়াল করিনি কারন মোটরচালিত রিকসায় উঠতে উঠতে ঢাকার সেই প্যাডেল রিকসার কথা ভুলেই গিয়েছি। উঠে বেশ চমৎকারই লাগছিলো রিকসা ওলা চাচা রিকসা আস্তে আস্তে টানছিলো হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম,

- চাচা আপনার রিকসায় মোটর নাই কেন? মোটর লাগায়ে নিবেন একটা এভাবে কি চালানো যায় নাকি? বয়স হয়েছে তো।

সামর্থ্য নাই বাবা, দিন আনি দিন খাই বহু কষ্টে এই রিকসাডাই চালায়, আজকে এটা নষ্ট হয়তো কালকে ওটা নষ্ট হয়। কি করমু সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার মধ্যে এমনে কষ্ট করা ছাড়া উপায় নাই বাবা।

- তাহলে তো বেশ সমস্যা। চাচা, আপনি কোথায় থাকেন?

গ্রামের বাড়ি তো বাবা রংপুর এইহানে জগদাল গ্রামে (শহর থেকে সামান্য দূরে একটা গ্রাম) থাকি।

• বাড়ি রংপুর তাহলে এই শহরে কেন চাচা? রংপুরেই তো কত ভালো সুবিধা আছে।

আমরার বাড়ি ভাটি অঞ্চলে, মেলা জায়গা জমিন ছিলো কি আর বলমু বাবা সব নদীতে ভাইঙ্গা লইয়া গেছে বসত ভিটা কিছুই নাই। আপনেগো এইহানে আইছেলাম কাজে তারপর থেইকা এইহানেই আছি প্রথমে রিকসা ভাড়ায় চালাইতাম পরে টেকা জমাইয়া পুরান মত একটা রিকসা কিনা চালাই অহন। প্রায় ৮ বছর ধইরা এইনে বউ মাইয়া লইয়া আছি।

কিন্তু আপনি তো ঢাকাতেও যেতে পারতেন ওখানে ইনকাম বেশি হতো না?

- ঢাকায় যেমন ইনকাম তেমন খরচ। অহন তো আর এত কষ্ট করতে পারি না অল্প স্বল্প যাই ইনকাম হয় চইলা যায়।- ও আচ্ছা, আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন? তারা কই? 

- বড় একটা ছেলে আছে বউ নিয়া ঢাকায় থাকে আমাগো খোজ নেয়না। আর একটা মাইয়া আছে স্কুলে পড়ে বড়ডারে বিয়া দিছি মেলা আগে।

এসব শুনে আমার নিজেরই মন খারাপ হলো শুধু শুধু প্রশ্নটা না জিজ্ঞেস করলেই হতো। কষ্ট করে খাচ্ছে এই বয়সেও রিকসা ঠিক মত প্যাডেলও দিতে পারে না অথচ এনার ছেলেরা নাকি ঢাকায় চাকরি করে খোজও নেয়না।

বাসায় সামনে নেমেই উনি বাজারের ব্যাগটা হাতে তুলে নিলো আর বললো,

- কোথায় দিয়ে আসতে হবে বাবা অনেক ভারি আপনি পারবেন না ।

- চাচা আপনিও পারবেন না দিন আমার হাতে দিন আমিই নিয়ে যাচ্ছি।

আমি মানিব্যাগ থেকে একটা নোট বের করে ওনার হাতে দিতেই বললো,

- বাবা আমার কাছে তো ভাংতি নাই ২০ টাকার জন্য এত বড় নোট ভাংতি পামু কই।

আচ্ছা তাহলে আপনি রেখে দিন।

- না বাবা, ২০ টাকার ভাড়া এত টাকা নিমু কেন। আপনি দাঁড়ান আমি ভাংতি করে আনি।

আহা আমি দিচ্ছি আপনি নিবেন তাতে সমস্যা কি?

- না বাবা আমি খেটে খাওয়া মানুষ কাজ না করে টাকা নিবো কেন বলেন?

উমম তাও ঠিক, আমি বললাম আচ্ছা চাচা আপনি ব্যাগটা আমাকে ৩ তলা অবদি দিয়ে আসুন।

উনি কোন কথা না বলে সোজা তিনতলা উঠে গেলেন। আমি বললাম,

- চাচা এবার তো আপনি এই টাকা রাখতে সংকোচ করবেন না! আপনি কষ্ট করেই টাকাটা নিচ্ছেন। তিন তলা অবদি এত ভারি ব্যাগ আনার ইনাম বাকি টাকাগুলো।

সে আর কিছু বললো না, ছলছলে চোখে হাসিমুখে টাকাটা নিয়ে চলে গেলো। আমি জানালায় দাড়িয়ে দেখছি দুপুরের কড়া রোদে তার লাল রঙের জ্বলে যাওয়া গামছাটা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এগোচ্ছে। তার মুখে আনন্দের হাসি।

"করিম চাচার মত আমাদের আশে পাশে বহু করিম চাচা আছে যারা নুন আনতে পান্তা ফুরায় তবুও খুবই অল্পতে তারা অনেক খুশি আছে।"যান্ত্রিক এই শহরের কোলাহলে আমাদের কারোর দিকে তাকানোর সময়টুকু হয়না। এই শহরের যান্ত্রিক এতশত রিকসার ভিড়ে করিম চাচার রিকসায় এখনো প্যাডেল ঘোরাতে হয়; কারন দারিদ্র্যতা। তবুও সে কষ্ট না করে পয়সা নিবে না, কষ্ট করেই তার প্রতিটি দিন পার হয়। অথচ কিছু মানুষ কি সুন্দর মানুষের হক, গরীবের হক মেরে খায়।

"এরকম কাউকে দেখলে চেষ্টা করবেন কিছুটা বাড়িয়ে দেবার৷ খরচার এই বাজারে আপনি আমি চালিয়ে নিতে পারলেও এনারা পারেন না |

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ