জীবনে কারো সঙ্গে আপোষ করতে পারিনি আমি। পরীক্ষা করে যা পেয়েছি, মানব সমাজকে তাই দিতে চেয়েছি। তার বদৌলতে পেয়েছি লাঞ্ছনা আর অপমান । বলতে গেলে জীবনের সবচেয়ে ভাল সময়টা লাঠি-ঝাটা খেয়ে কাটাতে হয়েছে আমার। যে কারণে দেখছ আমাকে এখানে। এর পেছনের ইতিহাসটা এই। আমি সহানুভূতির সুরে বললাম, খুবই দুঃখের ব্যাপার। প্রকৃত সত্যের জন্য যারা লড়াই করে তাদের এই দশাই হয়-ভদ্রলোক বললেন। আমি ভাবলাম, প্রেতাত্মার অস্তি ত্বের প্রমাণটাই কি তার সত্য নির্ধারণ। তবে কি ল্যাবরেটরীতে প্রাপ্ত ভাল পরীক্ষার ফল জগতকে জানাতে চেয়েছিলেন? আমার অনুমান, আর সে কারণেই হাস্যাস্পদ হয়েছেন সারা দুনিয়ার কাছে। ভদ্রলোক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, সম্ভবত আলোচনার এখানেই ইতি ঘটাতে চান।
বরফ পরা বন্ধ হয়ে গেছে, বাইরের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন। আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গেছে! আমি ভাবলাম, এখনও কুড়ি মাইল পথ হেঁটে যেতে হবে আমাকে। তাই উপত্যাকার ভিতর দিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না আমার। এই রাত্রে কুড়ি মাইল পথ হাঁটবেন বলেন কি? একটু অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, আমার স্ত্রী চিন্তা করে করে নিশ্চয়ই এতোক্ষণে আধমরা হয়ে গেছে। ভদ্রলোক আবার প্রশ্ন করলেন, আপনার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, ডাউলডিং। উনি বললেন, ডাউলডিং এখান থেকে তো কুড়ি মাইল হবেই। তবে সংক্ষেপ একটা পথ বলতে পারি আপনাকে। তাতে ছয়/সাত ঘন্টা সময় বেঁচে যাবে আপনার। আমি সম্মতি দিয়ে বললাম, অবশ্যই। তবে একটা ভাল ঘোড়া আর গাইডের জন্য আমি দশ পাউণ্ড ব্যয় করতে রাজি আছি। বৃদ্ধ হেসে বললেন, অত খরচের প্রয়োজন হবে না ।
আলোটা মিলিয়ে গেল সামনের গাঢ় অন্ধকারে। জ্যাকবের নির্দেশ মত পাথরের রেলিং বরাবর এগুতে লাগলাম আমি। মাঝে মাঝে একটু অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে শত শত নিশাচর যেন নিঃশব্দে আমার পিছু নিয়েছে। আমি দ্রুত হাঁটতে লাগলাম, সেই নিঃসীম অন্ধকারের মধ্যে। হাতে বন্দুক আছে ঠিকই, কিন্তু অন্ধকারে মানুষের চেয়ে অসহায় কে আর আছে?
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে লাগলো। ফলে বন্দুকটা হাত থেকে পড়ে যায় আর কি। উঁচুতে উঠতে গিয়ে আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল কিছুটা। হঠাৎ পেছন দিক থেকে মনে হলো একটা আলোক বিন্দু এগিয়ে আসছে এদিকে। প্রথমে ভাব- লাম, হয়তো জ্যাকবই বুঝি লণ্ঠন নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু না, একটা নয় এবার মনে হল দুটি আলোক বিন্দু । কোন সন্দেহ নেই হয়তো ডাক গাড়িটাই আসছে। বিস্ময়ে আমি অবাকই হলাম এইজন্য যে এরকম আবহাওয়ায় গাড়ি চালানো বিপদজ্জনক । ক্রমশই মনে হতে লাগল গাড়িটা এগিয়ে আসছে। হেডলাইড টিম টিম করে জ্বলছে দূরে। যদিও গাড়ির কোন আওয়াজ তখনও পাচ্ছিলাম না। তবে কি আমি ক্রসিংটা পার হয়ে এসেছি? হয়তো অন্ধকারে দেখতে পারিনি সাইনবোর্ডটা। আমার বিশ্বাস এটাই সেই রাতের ডাক গাড়ি। মুহূর্তের মধ্যে আমি স্থির করলাম, দৌড়ে গিয়ে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে পড়লাম মাঝখানে। আর সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা একটা ঝাকুনি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চালক জানালা দিয়ে গলা বের করে আমাকে দেখছিল। গাড়িতে উঠেই দেখলাম ভিতরে আরো তিনজন যাত্রী রয়েছে। আমি হলাম
চতুর্থ যাত্রী । আবার গাড়ি চলতে শুরু করল। আর আমার মন অস্বস্তিতে ভরে গেল কিছুক্ষণ বাদেই । কি রকম একটা স্যাঁত স্যাঁতে পরিবেশ আর কনকনে ঠাণ্ডা। বলে বুঝানো যাবে না একটা অস্বাভাবিক কটূ গন্ধ। আর তিনজন যাত্রী নির্জীব পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে। অথচ কেউ ঘুমোচ্ছে না। আমি বলে উঠলাম, কি দারুণ শীত পড়েছে আজ রাত্রে, তাই না? পাশের যাত্রিটি শুধু তাকালো, কিছুই বলল না। সবাই আমাকে লক্ষ্য করছে শুধু। হয়তো সকলের থেকে আমি একটু স্বতন্ত্র ওদের কাছে ।
হঠাৎ এক অজানা আশংকায় আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠল । আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, জানালাটা একটু খুলবো। পাশের যাত্রীরা কেউ সে কথার কোন উত্তর করলো না । আমি নিজেই জানালাটা এক টানে খুলে ফেলবার চেষ্টা করলাম । এক টুকরো চামড়াই শুধু ছিঁড়ে এলো আমার হাতে। এবার গাড়ির চারদিকটা তাকিয়ে দেখলাম, প্রায় তথৈবচ নোংরা আর সর্বত্র জোড়াতালি দেওয়া। আমি একজন যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম, এটা একটা সরকারী ডাক গাড়ি ।
দেখেছেন? অথচ কোন কালে এটা মেরামত হয় না। আমার কথা শুনে বেচারা ভ্রূ- কুঁচকালো । মনে হলো একটা মৃত মানুষ তার উপর দুটো চোখ ধক্ ধক্ করে জ্বলছে যেন। লোকটার কথা মনে আসতেই আমার সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠল ।
এদিকে ধীরে ধীর আমার শরীর মন অবসন্ন হয়ে উঠছে। ওদের এই বিভৎস চেহারা ছিন্নভিন্ন পোশাক যেন একটু আগেই কবর থেকে উঠে এসেছে ওরা। শুধু চোখদুটো জ্বল জ্বল করছে তখনও। এদিকে শীতের প্রকোপে অনেকটা নিস্তেজপ্রায় আমি । গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন আওয়াজই বেরুলো না। সর্বশক্তি দিয়ে দরজা ফাঁক করে সোজা ঝাপ মারলাম বাইরের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে এক বিরাট ধ্বসের সামনে চরকির মত কয়েক পা নিচে গড়িয়ে পড়ল গাড়িটা। আর স্বপ্নালোকের মতই দোমড়ানো সেই ভৌতিক সাইনবোর্ডটা চোখে পড়ল আমার । চুরমার হয়ে যাওয়া গাড়িটার একটা বিকট আওয়াজ ভেসে এলো কানে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই নিস্তব্ধতা ছেয়ে ফেলল চারদিক। জ্ঞান হারালাম আমি।
একদিন সকালবেলা চোখ খুলতেই সবিস্ময়ে দেখি আমার স্ত্রী পাশে বসে আছে। পরে জানলাম এক মেষ পালক ভাঙা সাইনবোর্ডের ধারে অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে খুঁজে পায়। সেই আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে।
সে যাত্রায় শুধু হাতটা ভেঙেছিল । মাথার খুলির উপর চোটটাও ছিল গুরুতর। তবে আমার নাম-ঠিকানা পকেটের কাগজ পেয়ে ওরা খবর দিতে পেরেছিল। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় আর চিকিৎসকের প্রচেষ্টায় এ যাত্রা বেঁচে গেলাম আমি। অবশ্য আমার স্ত্রীকে এই ভৌতিক কাহিনীটা কখনও বলিনি। অবশ্য চিকিৎসককে জানিয়েছিলাম ব্যাপারটা। তিনি অবশ্য আঘাতপ্রাপ্ত মস্তিষ্কে রাত্রিকালীন একটা দুঃস্বপ্ন বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন এটাকে। শুনে আমার রাগ হয়েছিল বটে। কিন্তু অযথা তর্কে গিয়ে মেজাজ খারাপ করিনি আমি। যা হোক এতোদিন বাদে আজ তোমাদের গল্পটা শুনিয়ে দিলাম। কি বল? তবে এসব কথার অনেক ব্যাখ্যা অবশ্য দেয়া চলে। তবে শেষ কথা হল, ঐ সাইনবোর্ডওয়ালা ক্রস রাস্তার সেই ভৌতিক গল্পটার আমিই ছিলাম সেই চার নম্বর যাত্রী !


0 মন্তব্যসমূহ