ভৌতিক অভিজ্ঞতা - পর্ব ১
গল্পটার স্মৃতি কোনদিনও মুছবে না আমার মন থেকে। তাই তোমাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ গল্পটা না শুনেই দুম করে কোন মন্তব্য করে বসো না। কারণ এক কথায় অভিজ্ঞতাটা যে অসাধারণ সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নাই। আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগের কথা। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি তখন।
গোটা ইংল্যান্ড শীতের দাপটে কাঁপছে। বন্দুক নিয়ে একদিন শিকারে বের হয়েছি। বনের ভিতরে এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে এক সময় পথ হারিয়ে ফেললাম। সামনে বিস্তীর্ণ পতিত জমি, ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় ৷পরিবেশটা শিকারের পক্ষে উপযুক্ত। এরই মাঝে বেশ কয়েকবার পথ হারিয়ে জেরবার হয়েছি আমি । ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে তুষার পাত । পার্বত্যভূমির পাদদেশ গিয়ে মিলিত হয়েছে যেখানে সেখান থেকে দূরত্ব অন্তত দশ/বারো মাইলের কম নয়। তবে সামনের ঘন জঙ্গলের আশপাশের জায়গাটা জনমানবহীন। জীবন্ত একটা প্রাণীর ছায়াও পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। ভীত হয়ে পড়লাম আমি। এ আমি কোথায় এলাম! এদিকে ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে। সকালে সামান্য নাস্তা ছাড়া কিছুই জোটেনি আমার। হঠাৎ বাতাস থেমে যেতেই বরফ পড়া শুরু হল। চারদিকে ঘন অন্ধকার নেমে এলো । এদিকে শীতে আমার হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে। আর এমন সময় মাস খানেক আগে বিয়ে হওয়া স্ত্রীর কথা মনে পড়ল আমার। হয়তো বেচারী ভেবে ভেবেই সারা হবে। অন্য দিনের মত আজকেও একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছিল আমাকে। কিন্তু এ কি দেখছি আমি। সব যেন ভাগ্যের খেলা!
এদিকে অবিরাম তুষার বর্ষণ চলছেই সমানে। রাত্রি আরও ঘন হয়ে উঠল। ইতস্তত হাঁটতে লাগলাম হঠাৎই চিৎকার করলাম, কেউ আছো আমাকে বাঁচাও! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো বার বার। নির্জনতা আরও অসহনীয়। সহসা মনে হল, শেষ পর্যন্ত বুঝি ঐ বরফের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আর কোন গত্যান্তর থাকবে না আমার । একথা ভাবতে আবার মনে পড়ল স্ত্রীর মুখখানি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার দুচোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মুহুর্তেই ভাবলাম, না-এখন সাহস, মনে বল চাই। সহসা কিছু দূরে একটা আলোর বিন্দু চোখে পড়ল। কে যেন এগিয়ে আসছে। আমি পাগলের মত সেদিকে দৌড়ালাম । আহঃ সেকি আনন্দ! বলে বোঝানো যাবে না। দেখি লণ্ঠন হাতে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। ওহঃ ঈশ্বর! কণ্ঠে আমার উল্লাস। এদিকে বৃদ্ধ তার লণ্ঠন উঁচু করে ধরে আমাকে নিরীক্ষণ করছে।
তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, কী ব্যাপার? কত ভাগ্য যে আপনাকে দেখতে পেলাম আমি। নইলে আমার তো মনে হচ্ছিল এই বরফের মধ্যে বুঝি প্রাণ হারাবো । ধন্যবাদ ঈশ্বরকে। বৃদ্ধ বলল, বহু লোকই তো মরেছে এ যাবৎ এখানে । আজ তুমি মরলেই বা এমন কি হতো। আমি বললাম, যা হোক ঈশ্বর চাইলে আপনার ও আমার মৃত্যুটা তবে সেটা যখন হয়নি তখন আপনাকে একা রেখে আর মরতে চাই না আমি। এখন বলুন ডাউলডিং এখন কত দূরে। বৃদ্ধ বললেন, অন্তত কুড়ি মাইল। বলতে পারেন কাছের গাঁ কোনটা? বৃদ্ধ বলল, এখান থেকে বারো মাইল হবে। এর কম নয় ওয়াইক। সে বলল, আপনি যাবেন কোথায়? হাতের লণ্ঠনটা উচিয়ে বৃদ্ধ বলল এই কাছাকাছি। আমি বললাম, বাড়ি যাচ্ছেন কি? সে উত্তর করল, হ্যাঁ। আমি বললাম, আমিও আজ আপনার সঙ্গে যাবো। বৃদ্ধ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কোন লাভ হবে না আমার সঙ্গে গিয়ে । উনি তোমাকে কিছুতেই ঢুকতে দেবেন না। আমি বললাম, উনিটা কে? আমার মনিব বৃদ্ধ বলল। এদিকে নিতান্ত অধৈর্য হয়ে পড়েছি আমি। চড়া সুরে বললাম, ব্যাপারটা না হয় আমার উপরেই ছেড়ে দিন। আসলে আপনি বুঝতে পারছেন না, আজ রাত্রে আমার একটা আশ্রয় খুবই দরকার। বৃদ্ধ নিরাশার সুরে বলল, বেশ চলো দেখি তাহলে দেখি। বৃদ্ধকে অনুসরণ করে বরফের পথ পার হয়ে হাজির হলাম সেখানে। হঠাৎই একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ ডেকে উঠল। আমি বললাম, এই বুঝি সেই বাড়ি ।
পকেট থেকে চাবি বের করে বৃদ্ধ দরজাটা খুলতে লাগল। চারদিকে লোহা আর পেরেক দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি জেলখানা পরিদর্শন করতে এসেছি। হল ঘরে ঢুকতেই দেখি চারধারে প্রচুর জিনিস, একধারে ছাদ অবধি শস্যের স্তূপ, অন্যদিক বস্তা ভর্তি আটা। চারপাশে নানা সরঞ্জাম পেঁপে, মাল-মসলা ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে চারচাকা লাগানো বিরাট এক টেলিস্কোপ। আর এই টেলিস্কোপটির গায়ে আটা নানান রকম নক্সা। সশব্দে একটা ঘন্টা বেজে উঠল। অমনি বৃদ্ধ সঙ্গী আমাকে ইঙ্গিত করল, যাও হে এবার তোমার ডাক পড়েছে। ঐ যাও মনিবের ঘরে। চৌকাঠ পেরিয়ে প্রায় বিনা অনুমতিতেই ঢুকে পড়লাম ভিতরে। সবিস্ময়ে দেখি বিশাল দেহের অধিকারী এক শুভ্রকেশী বৃদ্ধ ভদ্রলোক সামনের টেবিলের উপর এক গাদা বইপুস্তক স্তূপাকৃত তার সামনে। কে তুমি? এখানে কি করে এলে? কি চাও? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন আমাকে। আজে আমি একজন আইনজীবি। আমার নাম জেমস মুরে। অনেকটা পথ হেঁটেছি। তাই এখন আমার কিছু খাদ্য পানীয় আর ঘুমের জায়গা প্রয়োজন । ভুরু কুচকে তিনি তাকালেন আমার দিকে।
তারপর কর্কশ স্বরে বললেন, তোমার জানা উচিত আমার বাড়িটা কোন প্রমোদশালা নয় । প্রায় ধমকে জ্যাকবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কোন সাহসে লোকটাকে এখানে নিয়ে এসেছো। জ্যাকব বলল, আমি আনিনি হুজুর। সে বলল, আমি একজন বুড়ো মানুষ। আর এই লোকটা প্রায় সাড়ে ছ'ফুট লম্বা। ওকে বাধা দেওয়ার সাধ্যই আমার নেই। এবার মালিক এবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন একবার। তুমি কোন সাহসে এ ঘরে ঢুকেছো? আরও শান্তভাবে আমি বললাম, যে সাহসে একজন ডুবন্ত মানুষ হাতের কাছে নৌকো পেলে আঁকড়ে ধরে বাঁচবার জন্য। সেই আত্মরক্ষার অধিকার বলে আমি স্বেচ্ছায় এসেছি এখানে। ভদ্রলোক বলল, তার মানে? আমি আবার বলতে লাগলাম, আজ্ঞে দেখুন-তখনই মাটিতে প্রায় দুই ইঞ্চির মতন বরফ জমে গিয়েছিল। সারা রাত মাঠে থাকলে আমি কি শেষ পর্যন্ত বরফের তলে ডুবে যেতাম না? বৃদ্ধ এবার ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন, তা অবশ্য ঠিক। আদেশের সুরে বৃদ্ধ বললেন, জ্যাকব একে কিছু খাবার দাও । আর তুমি কাল অবধি এখানেই থাকতে পার যুবক। কথাটা শেষ করেই আবার বইপত্রের মাঝেই ডুবে গেলেন ভদ্রলোক।
এদিকে কৌতূহল নিয়ে ঘরের এক প্রান্তের দেয়ালে যেমন সব বিচিত্র ছবি, আর অন্য দিকে সৌরবিজ্ঞান গবেষণার সরঞ্জামাদি। যার অধিকাংশই এর আগে আমি কোনদিন দেখিনি। কত রকমের যে জিনিস রয়েছে বলে বুঝাতে পারবো না। নানা রকম বই, চিকিৎসা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, প্রচুর রাসায়নিক দ্রব্য আর যা সবচাইতে আমাকে অবাক করল তা সৌরজগত অনুসন্ধানকারী কলকব্জার নিখুঁত কিছু মডেল। এক কথায় যার কোন তুলনা নেই। বিচিত্র এই গবেষণাগার। এরকম বিচিত্র মানুষ এর আগে কখনও দেখিনি। পরে অবশ্য ভাবনা এসেছিল এ বিরান জঙ্গলে তিনি কেন এভাবে বাস করছেন। অদ্ভুত একজন বৈজ্ঞানিক যার শুভ্রকেশ ভরা সৌম্য চেহারা, দেখলে একজন কবি বলে মনে হয় তাঁকে। অনমনীয় রু চেহারার উপর তার চোখ দুটি দেখলেই লুইস ভন বিটোফেনের কথা মনে পড়ে যায় আমার। ইতোমধ্যে জ্যাকব ডিম, শুয়োরের মাংস আর এক বোতল শেলি খেতে দিল আমাকে। গৃহকর্তা সোৎসাহে একটু হেসে বললেন, এসবই আমার খামারের। আশা করি তোমার ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয় বলে খেতে লাগলাম আমি। এতো ভাল লাগছিল যা বলার নয়।
গৃহকর্তা আমার সঙ্গে বসে আহার সারলেন। আহারের ফাঁকেই আপন মনে বলতে লাগলেন, দ্যাখো আজ প্রায় তেইশ বছর ধরে এখানে আছি আমি। বাইরের কোন লোক এখানে আসেনি এখনো। এমনকি দীর্ঘদিন বহিদুনিয়ার কোন সংবাদও আমার কাছে পৌঁছায়নি। গত চার বছরের মধ্যে তুমি একমাত্র প্রথম আগন্তুক । আমাকে কোন নতুন খবর শোনাও তো? আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। ভদ্রলোক বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে এমন সব কঠিন প্রশ্ন করতে আরম্ভ করলেন, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও রীতিমত হিমসিম খেয়ে গেলাম । প্রশ্ন ছেড়ে উনি বিশ্লেষণে গেলেন । কি অসাধারণ বিশ্লেষণ যা বহু গুণীজন লোককেও হার মানিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। তার প্রতিটি অভিমতই অভিনব। আমি মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনতে লাগলাম ।
সন্দেহ নেই এক আশ্চর্য স্বপ্ন বিলাসীর মুখোমুখি হয়েছি আমি। আর খুব দ্রুত বিষয়বস্তুর পরিবর্তন করেছেন তিনি সাধারণ বিজ্ঞান থেকে মনস্তত্ব, বৈদ্যুতিক তার থেকে নার্ভের বিদ্যুৎ, ওয়ার্ট থেকে মেসমার, হেন দার্শনিক নেই এই যেমন কানডিলাক, ডেককারটেস, বার্কলি, কনডিল্যাক, স্পিনোজা, অ্যারিস্টটল, প্লুটো, মায়সব সঙ্গীত নৃত্যকলা ইত্যাদি বিষয়ে তার জ্ঞান অগাধ। অতঃপর অতীন্দ্রিয় জগৎ প্রসঙ্গ টেনে আনলেন আলোচনায়। তিনি বলতে লাগলেন দিন দিন সমাজ ব্যবস্থা এমন সংকীর্ণ হয়ে উঠছে যে আমরা আজকাল চাক্ষুষ জগতের বাইরেই কোন কিছুকে সহজে স্বীকার করি না। অথচ ফিজিক্স, হিস্ট্রি, আরকিওলোজি এই অপার্থিব জগতের মতোন কোন কিছুর সীমা নেই এমন ব্যাপকভাবে বিস্তৃতও নয়। অথচ পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষ এই অতীন্দ্রিয়বাদে ঘোর বিশ্বাসী। অথচ এক শ্রেণীর মানুষ ল্যাবরেটরী পরীক্ষাতে যা ধরতে পরে না। তাই এক শ্রেণীর বিজ্ঞানীদের কাছে যেন তার কোন মূল্যই নেই। আর আদালতে দাঁড়িয়ে এসব কথা বললে হয় তুমি বলবে পাগল, কিংবা নিরেট গর্ধভ। তার মুখ দেখে আমার সন্দেহ হলো হয়তো ভদ্রলোক সৌরবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে অতীন্দ্রিয় চর্চাও করেন বুঝি। বৃদ্ধ এবার বললেন, কেন জান আমি এই জঙ্গলে বাস করছি।


0 মন্তব্যসমূহ